মরণঘাতী হান্তাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত হওয়ার পর একটি ক্রুজ জাহাজ (প্রমোদতরি) থেকে তিনজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গুরুতর অবস্থায় থাকা দুই ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য নেদারল্যান্ডসে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা 'ওশানওয়াইড এক্সপিডিশনস'।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, স্থিতিশীল অবস্থায় থাকা তৃতীয় এক যাত্রীকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্ধারিত ফ্লাইটটি বিলম্বিত হয়েছে। 'এমভি হোন্ডিয়াস' নামের জাহাজটি পশ্চিম আফ্রিকা উপকূলের দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে-র কাছে তিন দিন নোঙর করে থাকার পর এখন স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাত্রা করছে।
সরিয়ে নেওয়া তিন ব্যক্তির মধ্যে একজন ব্রিটিশ, একজন ডাচ এবং একজন জার্মান নাগরিক। ওশানওয়াইড এক্সপিডিশনস জানিয়েছে, ৬৫ বছর বয়সী জার্মান নাগরিকটি গত ২ মে জাহাজে মারা যাওয়া এক জার্মান নারীর সঙ্গে "ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত" ছিলেন। ব্রিটিশ নাগরিকটিকে ৫৬ বছর বয়সী প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তা মার্টিন আনস্টি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, যার অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। এছাড়া ৪১ বছর বয়সী একজন ডাচ ক্রু সদস্যকেও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পৃথকভাবে, ডাচ গণমাধ্যম বৃহস্পতিবার জানিয়েছে যে, আমস্টারডামে কেএলএম এয়ারলাইন্সের একজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টকে হান্তাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ওই স্টুয়ার্ডেস একজন ৬৯ বছর বয়সী ডাচ নারীর সংস্পর্শে এসেছিলেন বলে জানা গেছে। ওই নারী দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি বিমানে ওঠার পর খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি মারা যান এবং দক্ষিণ আফ্রিকান কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে সম্ভাব্য হান্তাভাইরাস কেস হিসেবে তদন্ত করছে।
এক মাস আগে আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত জাহাজটির মোট তিনজন যাত্রী মারা গেছেন। এদিকে, জাহাজ থেকে আগে নেমে যাওয়া তিন যাত্রীর ওপর নজরদারি করার কথা বিবিসি-কে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি অঙ্গরাজ্য। জর্জিয়া ও অ্যারিজোনা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের কারও শরীরে কোনো উপসর্গ নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, জাহাজ থেকে নেমে সুইজারল্যান্ডে ফিরে যাওয়া এক ব্যক্তির শরীরে হান্তাভাইরাস পজিটিভ পাওয়া গেছে এবং তিনি জুরিখের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেন, "জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থার পাঠানো সতর্কবার্তা পেয়ে ওই রোগী নিজেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার সাড়া দিয়েছেন।"
এমভি হোন্ডিয়াস জাহাজে বর্তমানে ২৩টি দেশের মোট ১৪৬ জন ব্যক্তি "কঠোর সতর্কতামূলক ব্যবস্থার" অধীনে অবস্থান করছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এই জাহাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আটটি কেস (তিনটি নিশ্চিত এবং পাঁচটি সন্দেহভাজন) শনাক্ত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ল্যাটিন আমেরিকায় দেখা যাওয়া হান্তাভাইরাসের 'আন্দিজ স্ট্রেইন' দুই রোগীর শরীরে পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নির্দিষ্ট স্ট্রেইনটি মানুষের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৃত তিনজনের মধ্যে একজন ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন, বাকি দুজনের মৃত্যুর কারণ তদন্তাধীন। মৃতদের মধ্যে সেই ৬৯ বছর বয়সী ডাচ নারীও রয়েছেন যিনি ২৪ এপ্রিল সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নেমে গিয়েছিলেন। ১১ এপ্রিল তাঁর স্বামীও জাহাজে মারা যান, তবে তাঁর সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মৃত তৃতীয় ব্যক্তি হলেন একজন জার্মান নারী, যার মরদেহ এখনও জাহাজে রয়েছে।
বুধবার যাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে তাদের কারও শরীরে এখনও পজিটিভ রেজাল্ট আসেনি, তবে দুজনের শরীরে উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। এদিকে যুক্তরাজ্যের হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সি জানিয়েছে, দুজন ব্রিটিশ নাগরিক সম্ভাব্য সংক্রমণের আশঙ্কায় নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে আছেন।
হান্তাভাইরাস সাধারণত ইঁদুর বা রোডেন্ট জাতীয় প্রাণী থেকে ছড়ায়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের কারণে এটি মানুষের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়িয়েছে। যদিও সাধারণ জনগণের জন্য এর ঝুঁকি খুবই কম বলে জানানো হয়েছে।