বিদেশ ভ্রমণে ভারতীয় পর্যটকদের কিছু আচরণ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিয়েতনামের বিমানবন্দরে নৃত্য, ইন্দোনেশিয়ার বালিতে হোটেলের সামগ্রী চুরির অভিযোগ এবং থাইল্যান্ডের একটি জনপ্রিয় বিচ ক্লাবে প্রবেশ নিয়ে বিতর্কসহ একাধিক ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার পেছনে রয়েছে ভাইরাল কনটেন্টের সংস্কৃতি, পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি, স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং সামাজিক মাধ্যমনির্ভর ভ্রমণ প্রবণতা।

সম্প্রতি ভিয়েতনামের একটি বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের কাছে কয়েকজন ভারতীয় পর্যটককে ঐতিহ্যবাহী ‘গার্বা’ নৃত্য করতে দেখা যায়। ভিডিওটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের থামিয়ে দেয়। যদিও ঘটনাটি কোনো বড় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়নি, তবু নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে এটি সমালোচনার মুখে পড়ে।

অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার বালির একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট চার ভারতীয় পর্যটকের বিরুদ্ধে কক্ষের বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ আনে। চেকআউটের সময় ব্যাগ তল্লাশিতে তোয়ালে, হেয়ার ড্রায়ার, কিমোনো, টিভি রিমোট বক্সসহ বেশ কয়েকটি সামগ্রী উদ্ধার হয়। পরে পর্যটকরা সেগুলো ফেরত দিলে হোটেল কর্তৃপক্ষ আইনি পদক্ষেপ নেয়নি।

থাইল্যান্ডের ফুকেটে অবস্থিত জনপ্রিয় ইয়োনা বিচ ক্লাবকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়। কয়েকজন ভারতীয় পর্যটক অভিযোগ করেন, জাতীয়তার কারণে তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তবে ক্লাব কর্তৃপক্ষ দাবি করে, তাদের নির্ধারিত প্রবেশনীতি ও নারী-পুরুষ অনুপাতের শর্ত পূরণ না করায় ওই দলকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সামাজিক মাধ্যমের অনেক ব্যবহারকারী আবার অতীতে কিছু পর্যটকের অসদাচরণের কথাও তুলে ধরেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনার অন্যতম কারণ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা। বর্তমানে অনেক পর্যটক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা উপভোগের চেয়ে নজরকাড়া ভিডিও বা ছবি তৈরিতে বেশি মনোযোগী। ফলে কখনও তারা স্থানীয় নিয়মকানুন বা সামাজিক শিষ্টাচার উপেক্ষা করে বসেন।

আরেকটি বড় কারণ হলো ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় পর্যটকদের উপস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে অল্পসংখ্যক পর্যটকের নেতিবাচক আচরণও সহজেই আলোচনায় চলে আসে এবং পুরো জাতিগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করছে বলে মনে হয়।

স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যে আচরণ নিজ দেশে স্বাভাবিক, তা অন্য দেশে অগ্রহণযোগ্য বা বিরক্তিকর বলে বিবেচিত হতে পারে। ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেও বিতর্কের জন্ম দেয় কিছু কর্মকাণ্ড।

গবেষকদের মতে, বর্তমানে ‘কনটেন্ট ফার্স্ট ট্রাভেল’ নামে একটি প্রবণতা বাড়ছে। অর্থাৎ ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য হয়ে উঠছে সামাজিক মাধ্যমে কনটেন্ট প্রকাশ, অভিজ্ঞতা অর্জন নয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে পুরো একটি দেশের পর্যটকদের বিচার করা ঠিক নয়। একই ধরনের প্রবণতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের মধ্যেই দেখা যায়। তবুও বিদেশে দায়িত্বশীল আচরণ, স্থানীয় আইন ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং সচেতন ভ্রমণ সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলছেন তারা।