ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রত্নসম্পদ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মুন্সীগঞ্জকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন নগরীতে পরিণত করার সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এ জেলা দেশের পর্যটন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদীবেষ্টিত মুন্সীগঞ্জ বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। পাল, সেন, সুলতানি ও মোগল আমলের অসংখ্য নিদর্শন আজও জেলার বিভিন্ন স্থানে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপমহাদেশের বহু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের স্মৃতি।

বৌদ্ধ পণ্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, বুদ্ধদেব বসু, কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের স্মৃতিবিজড়িত এই জেলা ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ বহন করে।

মুন্সীগঞ্জের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে মোগল আমলের ইদ্রাকপুর কেল্লা, রামপালে বল্লাল সেনের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ, বাবা আদম মসজিদ, বজ্রযোগিনীর পণ্ডিত ভিটা, সোনারংয়ের জোড়া মঠ, নাটেশ্বর বৌদ্ধ মন্দির, শ্যামসিদ্ধির মঠ, শেখরনগরের প্রাচীন কালী মন্দির, টেংগর শাহী মসজিদ, নগরকসবা এবং ঐতিহাসিক পুলঘাটা ইটের সেতু।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের পাশাপাশি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য রয়েছে বিস্তীর্ণ আড়িয়ল বিল। বর্ষাকালে বিলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে শত শত ভ্রমণপিপাসু এখানে ভিড় করেন। এছাড়া পদ্মা সেতু, মাওয়া ও শিমুলিয়া এলাকার নদীকেন্দ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশও পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে।

জেলা পরিষদের প্রশাসক এ কে এম ইরাদত বলেন, মুন্সীগঞ্জের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে জেলাটিকে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব। অন্যদিকে শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক মো. মাহবুবুর রহমানের মতে, অনেক প্রত্নস্থানের বিষয়ে সাধারণ মানুষের পর্যাপ্ত ধারণা নেই। এসব স্থানে তথ্যফলক, বিশ্রামাগার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের দাবি, মাওয়া ও আড়িয়ল বিলকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়বে। বর্তমানে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের কারণে জেলার প্রায় ৫০টি দর্শনীয় স্থানে সহজে ভ্রমণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী জানিয়েছেন, মুন্সীগঞ্জকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ৫০ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানগুলো দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।